দায়িত্বের শুরুতেই ইউএনওর হস্তক্ষেপে থামল বাল্যবিবাহ, ‘আইন ও সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রধান শক্তি


বার্তা বিভাগ প্রকাশের সময় : জুলাই ২৪, ২০২৬, ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ /
দায়িত্বের শুরুতেই ইউএনওর হস্তক্ষেপে থামল বাল্যবিবাহ, ‘আইন ও সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রধান শক্তি

রবিউল ইসলাম,রাজশাহী ব্যুরো: দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা ফারজানা। তাঁর তাৎক্ষণিক নির্দেশনায় একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হওয়ায় এলাকাজুড়ে প্রশংসার সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুর্গাপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বহরমপুর গ্রামে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী শাবানা খাতুনের সঙ্গে চারঘাট উপজেলার বাসিন্দা নিরব (২০)-এর বিয়ের আয়োজন চলছিল। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসতেই ইউএনও উম্মে হাবিবা ফারজানা দ্রুত থানার পুলিশ ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ইউএনওর নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দেয়। পরে উভয় পক্ষের কাছ থেকে ভবিষ্যতে এ ধরনের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না—এ মর্মে মুচলেকা নেওয়া হয়।
কিশোরীর বাবা সিদ্দিক আলী নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, আমি বুঝতে পেরেছি বাল্যবিবাহ কতটা ক্ষতিকর। আমার মতো ভুল যেন আর কোনো অভিভাবক না করেন, সেই আহ্বান জানাই।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিকরা বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি, নারী শিক্ষার প্রসার, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু বলেন, বাল্যবিবাহ হলো আইন নির্ধারিত বয়সের আগেই কোনো ছেলে বা মেয়ের বিবাহ। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয় কিশোরীরা। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফাতেমা খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, বাল্যবিবাহ একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং শিশুর মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এ অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।

এ বিষয়ে অগ্রগামী বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সেল (ABPS)-এর পরিচালক রবিউল ইসলাম বলেন,
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কেবল প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক—সবার সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা মানে শুধু একটি বিয়ে বন্ধ করা নয়, বরং একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বপ্ন ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামে শক্তিশালী প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকলে বাল্যবিবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, নতুন ইউএনওর এমন তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং আইনের শাসনের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, একই ধারাবাহিকতায় উপজেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সচেতনতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও বেগবান হবে।