শুল্কের চাপেই থমকে যাচ্ছে ভারতীয় মাছ আমদানি, সংকটে বেনাপোল বন্দর


বার্তা বিভাগ প্রকাশের সময় : জুলাই ২৩, ২০২৬, ১:২২ অপরাহ্ণ /
শুল্কের চাপেই থমকে যাচ্ছে ভারতীয় মাছ আমদানি, সংকটে বেনাপোল বন্দর

বেনাপোল প্রতিনিধি: নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭) থেকে মাছ আমদানির ওপর শুল্কহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পর দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারতীয় মাছ আমদানি দ্রুত কমে এসেছে। আমদানিকারকদের দাবি, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের আশঙ্কায় মাছ আমদানি সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ব্যবসা, শ্রমবাজার, পরিবহন খাত এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ে।
আমদানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন বাজেটে মাছ আমদানির মোট শুল্কহার ৪৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। বাজেট কার্যকর হওয়ার পরদিন থেকেই বেনাপোল কাস্টমস নতুন হারে শুল্ক আদায় শুরু করে। এরপর থেকেই বন্দর দিয়ে ভারতীয় মাছের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কাস্টমস সূত্র জানায়, আগে প্রতি কেজি মিঠা পানির মাছ আমদানিতে ৮৬ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক দিতে হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৬ টাকা অতিরিক্ত শুল্ক গুনতে হচ্ছে। একইভাবে সামুদ্রিক মাছ ও রুই মাছের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে শুল্ক ৪৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬ টাকা ১০ পয়সা, যা কেজিপ্রতি প্রায় ২৪ টাকা বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় মাছের দেশে চাহিদা থাকলেও বাড়তি শুল্কের কারণে আমদানি লাভজনক থাকছে না। ফলে অনেকেই আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাজারে মাছের দাম আরও বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।
মাছ আমদানিকারক রহমত আলী বলেন, অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানিতে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন চালান আনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত শুল্কহার পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
আরেক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামোয় ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিটি চালানে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হওয়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
মাছ আমদানি কমে যাওয়ায় বন্দরের শ্রমিকদের কাজও কমে গেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, আগে নিয়মিত মাছবোঝাই ট্রাক খালাসের কাজ থাকলেও এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও কাজ মিলছে না। একইভাবে ট্রাকচালকরাও পরিবহন সংকটে পড়েছেন।
বেনাপোল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ট্রাকের ওজনের পরিবর্তে চাকার সংখ্যার ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের কারণে আগেই মাছ আমদানিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। নতুন বাজেটে আরও শুল্ক বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তিনি বলেন, শুল্কহার পুনর্বিবেচনা না হলে আমদানি, ব্যবসা ও রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি জানান, আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক মাছ বন্দর দিয়ে প্রবেশ করলেও এখন তা কমে মাত্র ৪ থেকে ৫ ট্রাকে নেমে এসেছে। ফলে পরিবহন খাতের অনেক সদস্য কার্যত বেকার হয়ে পড়েছেন।
বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, বাজেট ঘোষণার আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক মাছ আমদানি হতো। নতুন শুল্ক কার্যকরের পর সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরেও আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন মাছ কম আমদানি হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মুক্তা চৌধুরী জানান, গত অর্থবছরে বন্দর দিয়ে এক কোটি ২৬ লাখ ৭ টন মিঠা পানির মাছ এবং ৭৪ লাখ ৮১ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পর এখন পর্যন্ত ৩৮৬ টন মিঠা পানির মাছ এবং ১৯৪ টন সামুদ্রিক মাছ আমদানি হয়েছে।
অন্যদিকে, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নতুন শুল্কের কারণে আমদানি আরও কমে গেলে এই ঘাটতি বাড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের প্রতিনিধিদের অভিমত, মাছ আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক শুধু ব্যবসাকেই নয়, কর্মসংস্থান, বাজারদর এবং সরকারের রাজস্ব আয়কেও প্রভাবিত করছে। তাই দেশের বাজার ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় শুল্কহার পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।