দুর্গাপুরে কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীনের ‘ম্যাজিক’: এয়ার ফ্লো মেশিনে কৃষকের ভাগ্যবদল


বার্তা বিভাগ প্রকাশের সময় : মে ১৯, ২০২৬, ১২:৩৮ অপরাহ্ণ /
দুর্গাপুরে কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীনের ‘ম্যাজিক’: এয়ার ফ্লো মেশিনে কৃষকের ভাগ্যবদল

রবিউল ইসলাম, রাজশাহী ব্যুরো: বাংলার কৃষক মানেই এক বুক আশা আর কপালে ঘাম মুছে ফলানো সোনালি ফসল। অট্টালিকার মানুষদের অন্ন জুগিয়ে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, সেই কৃষকরাই অনেক সময় ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম লোকসানের মুখে পড়েন। বিশেষ করে পচনশীল ফসল পেঁয়াজ নিয়ে প্রতি বছরই চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তবে এবার সেই দুশ্চিন্তাকে জয়ে রূপান্তর করেছেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী। তার হাত ধরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আধুনিক প্রযুক্তির ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ বিতরণের মাধ্যমে দুর্গাপুরে শুরু হয়েছে এক নীরব কৃষি বিপ্লব।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে উপজেলার প্রান্তিক পেঁয়াজ চাষিদের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ১২০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিটি মূলত পেঁয়াজ সংরক্ষণের প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।

সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ঘরে রাখলে দ্রুত পচে যায়, কিন্তু এই মেশিনের সাহায্যে ৮ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সম্পূর্ণ তাজা ও সতেজ রাখা সম্ভব। প্রতিটি মেশিনের সাহায্যে এক স্থানে ২৫০ থেকে ৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়।

সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই মেশিনে পেঁয়াজ রাখলে প্রাকৃতিকভাবে ওজন কমে না এবং পচনের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
এই আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণ চাষিদের জীবনে কতটা স্বস্তি এনেছে, তা উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে।

কৃষক মোঃ আঃ বাক্কার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন: আগে খেত থেকে পেঁয়াজ তোলার পর বুক কাঁপত। পচে যাওয়ার ভয়ে বাজার কম থাকলেও তড়িঘড়ি করে কম দামে বিক্রি করে দিতাম। কিন্তু এবার কৃষি অফিস থেকে এয়ার ফ্লো মেশিন পাওয়ার পর আমি নিশ্চিন্ত। এখন আর পচনের ভয়ে কম দামে পেঁয়াজ ছাড়ব না, দাম বাড়লে তবেই বাজারে নেব। এটা আমাদের মতো গরিবের জন্য ওপরওয়ালার আশীর্বাদ।

অপরদিকে কৃষক অমিত কুমার নামে সুবিধাভোগী আরেক চাষি বলেন: এই মেশিনটা আমাদের কাছে ম্যাজিকের মতো। আগে ঘরে পেঁয়াজ রাখলে মাসখানেক পরেই পচন ধরত, শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে যেত। এখন ৩০০ মণ পেঁয়াজ এক জায়গায় রাখছি, অথচ সব একদম টানটান তাজা! কৃষি অফিসার স্যার আমাদের যে বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন, তা মুখে বলে শেষ করা যাবে না।

স্থানীয় এক তরুণ উদ্যোক্তা চাষি কৃষকদের স্বাবলম্বী হওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন: সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তি পেলে যে কৃষকরা স্বাবলম্বী হতে পারে, দুর্গাপুর তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা এখন আর মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে জিম্মি নই। আমরা এখন নিজেরাই মজুতদার, নিজেরাই মালিক।

বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও সাবেক উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম সাকলায়েন
বাজারের ভারসাম্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন: ভরা মৌসুমে পেঁয়াজের দাম পানির দরে নেমে যায়, আর অসময়ে সাধারণ মানুষ চড়া দামে কেনে। এই ব্যবধানের মূলে ছিল সঠিক সংরক্ষণের অভাব। দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে কৃষকরা এখন ফসল ধরে রাখতে পারছেন। এতে বাজারের অস্থিরতা কমবে এবং কৃষক সরাসরি লাভবান হবে। এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এই সফলতার মূল কারিগর ও দূরদর্শী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন: আমরা চেয়েছি প্রযুক্তির সুফল যেন সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছায়। বিনামূল্যে বিতরণ করা এই ১২০টি মেশিন এখন কেবল লোহার যন্ত্র নয়, বরং দুর্গাপুরের শত শত কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। কৃষকদের কৃতজ্ঞতা ও সাফল্যই আমাদের কাজের সার্থকতা। দিনে দিনে এই প্রযুক্তির চাহিদা এখন পুরো জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, যা আমাদের কৃষিকে আরও শক্তিশালী করবে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ফিরোজ আহম্মেদ বলেন: সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা আর আন্তরিকতা থাকলে মাঠপর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তাও যে গোটা একটি অঞ্চলের কৃষিশিল্পে আমূল পরিবর্তন আনতে পারেন, দুর্গাপুরের এই ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ প্রকল্প তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সাহানা পারভীন লাবনী স্যারের এই ‘ম্যাজিক’ এখন সারা দেশের কৃষি কর্মকর্তাদের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল হয়ে থাকবে।

দুর্গাপুরের এই সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও সদিচ্ছা থাকলে কৃষকের ভাগ্যবদল অসম্ভব কিছু নয়। সাহানা পারভীনের এই ‘ম্যাজিক’ মডেল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের পেঁয়াজ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।