এক তরুণীর কান্নায় আলোচনায় অভিযুক্ত চার ভাই, তদন্তে নতুন প্রশ্ন


বার্তা বিভাগ প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ১:০০ অপরাহ্ণ /
এক তরুণীর কান্নায় আলোচনায় অভিযুক্ত চার ভাই, তদন্তে নতুন প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ টাকার গরম আর ক্ষমতার দাপটে পার পেলেও এবার এক অসহায় তরুণীর কান্নায় ও জেদের মুখে অবশেষে বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক মাফিয়া ৪ ভাই। দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের জেরে বিয়ের দাবিতে প্রেমিক সোহেলের (৩২) বাড়িতে অনশন ও অবস্থান নিয়েছেন পলি (২৮) নামের এক তরুণী। গত বুধবার বিকেল আনুমানিক ৪টা থেকে গোদাগাড়ীর মাদারপুর ডিমভাঙ্গা এলাকার এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
​ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সোহেল ডিমভাঙ্গা এলাকার মজিবুর রহমানের ছেলে এবং ভুক্তভোগী পলি একই এলাকার ফেজুর মেয়ে। সম্পর্কে তারা একে অপরের মামাতো-ফুফাতো ভাই-বোন।

​ভুক্তভোগী পলির অভিযোগ, দীর্ঘ এক বছর ধরে সোহেলের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত তিন মাস ধরে সোহেল তার সাথে বারবার জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পলির পরিবারে কোনো পুরুষ মানুষ নেই, তার বাবা প্যারালাইসিস হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী। এই সুযোগে এবং মাদকের ব্যবসার ভয় দেখিয়ে সোহেল প্রায়ই জোর করে তার বাড়িতে যেতো। সম্পর্কের একপর্যায়ে পলি গর্ভবতী হয়ে পড়লে জোরপূর্বক তার একটি সন্তান নষ্ট (গর্ভপাত) করা হয়। বর্তমানেও পলি ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে দাবি করেছেন। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকেই সোহেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং তাকে মারধরসহ প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে।

​কান্নাভেজা কণ্ঠে পলি প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন,
​আমাকে ৫- ৬ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি রফা করার চেষ্টা করছে সোহেলের পরিবার ও কিছু দালাল। তারা বলছে টাকা নিয়ে চলে যেতে। কিন্তু আমি টাকা চাই না, আমি সোহেলকে সামাজিক স্বীকৃতি ও বিয়ে করতে চাই। প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের কাছে আকুল আবেদন, আমার বিয়ের ব্যবস্থা করুন এবং বিয়ের পর সে যেন আমাকে তালাক দিতে না পারে সেই আইনি নিশ্চয়তা দিন। তা না হলে আমার কাছে পেট্রোল ও গ্যাস লাইট আছে, আমি নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যা করব।

​পলি আরও জানান, তিনি এর আগে গোদাগাড়ী মডেল থানায় একটি লিখিত জিডি করেছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে ৩-৪ বার সালিশ-বৈঠক হলেও প্রভাবশালী এই চক্রের কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

​পলির এই অনশনের সূত্র ধরে বেরিয়ে এসেছে সোহেল ও তার ৪ ভাইয়ের চাঞ্চল্যকর অপরাধের চিত্র। স্থানীয় প্রবীণ বিএনপি নেতা, জামায়াতের বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বি এবং সাধারণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এই চার ভাইয়ের চরিত্র ও কর্মকাণ্ড একই রকম।
​স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই চার ভাই সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে নদীপথে অবৈধ অস্ত্র ও হেরোইন এনে গোদাগাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করে জিরো থেকে হাজার কোটি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে। বিগত দিনে সাবেক প্রয়াত ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক এই এলাকায় খোঁজখবর নিতে এলে এই ভাইয়েরা মিলে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল এবং মন্ত্রীর ওপর হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিছু নেতার প্রচ্ছন্ন আশ্রয়ে থাকায় সেসব ঘটনার কোনো বিচার হয়নি।

​অনুসন্ধানে এই ৪ ভাইয়ের বিরুদ্ধে একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার তথ্য মিলেছে
​মো: মনিরুল ইসলাম (৪৮): মাদকের ‘টপ সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালে ৪ কেজি হেরোইনসহ গ্রেফতার হওয়া ছাড়াও তার বিরুদ্ধে পুঠিয়া ও চারঘাট থানায় মাদক আইনের একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে মারামারি ও বিস্ফোরক আইনে মামলা (নং ২৫আই/২৫) রয়েছে এবং বর্তমানে ২টি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তিনি পলাতক।
​মো: মেহেদী হাসান (৪৪): শীর্ষ মাদক কারবারী। ২০১২ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা (গোদাগাড়ী এফআইআর নং-২৩) রয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হওয়া এই আসামিও বর্তমানে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি।
​মো: আব্দুর রহিম টিসু (৩৮): মাদকের অন্যতম গডফাদার। ২০১০ সাল থেকে বোয়ালিয়া ও গোদাগাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মাদকের মামলা রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ মে ৪ কেজি ৩০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা (নং-১৩) হয়।
​মো: সোহেল রানা (৩৮): শীর্ষ মাদক মাফিয়া ও ‘ব্যান্ডার বাহিনী’র মূল হোতা। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে গোদাগাড়ী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এবার তরুণীর করা ধর্ষণ ও গর্ভপাত মামলায় তিনি প্রধান অভিযুক্ত।

​ঘটনার খবর পেয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঙ্গীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়।
​এই বিষয়ে গোদাগাড়ী মডেল থানার ওসি জানান, অভিযুক্তরা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। বর্তমান ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
​এই বিষয়ে ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ এর খ (ধর্ষণ) এবং দণ্ডবিধির গর্ভপাত সংক্রান্ত ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত সোহেল বর্তমানে পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
​এদিকে এই ঘটনার পর থেকে মাদারপুর ডিমভাঙ্গা এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকার সচেতন নাগরিক ও যুবসমাজের প্রতিনিধিরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই চিহ্নিত অপরাধী ভাইদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে তারা কঠোর সামাজিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন।