সর্বশেষ :

বারী সিদ্দিকী: বাঁশির সুরে লোকজ আত্মার আর্তি


অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : জুলাই ১৯, ২০২৫ । ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
বারী সিদ্দিকী: বাঁশির সুরে লোকজ আত্মার আর্তি

মো. মানিক হোসেন, ঢাকা : বারী সিদ্দিকী—এই নামটি বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে গেঁথে আছে গভীর ভালোবাসা আর আবেগে। বাঁশির মায়াবী সুর আর দরদভরা কণ্ঠের মাধ্যমে তিনি ছুঁয়ে গেছেন গ্রামীণ জনপদের প্রাণ। বাউল, ভাটিয়ালি, মারফতি, মরমি—লোকসংগীতের নানা ধারার সমন্বয়ে তিনি তৈরি করেছেন এমন এক সংগীতজগৎ, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ২০১৭ সালে মৃত্যুবরণ করলেও আজও তার গান বাংলা সংগীতপ্রেমীদের কান ও মনে প্রতিধ্বনিত হয়।

১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন বারী সিদ্দিকী। সংগীতের প্রতি আকর্ষণ ছিল পারিবারিক সূত্রেই। তার পিতা একজন সংগীতানুরাগী ছিলেন, যিনি ছেলেকে উৎসাহিত করতেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে সংগীতচর্চা শুরু করেন। প্রথমে স্থানীয় ওস্তাদদের কাছেই সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি।
বারী সিদ্দিকীর সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়েছিল শাস্ত্রীয় সংগীত দিয়ে। ওস্তাদ গোপাল দত্তের কাছে সংগীতের গভীর তালিম নেন। পরবর্তীতে ভারতের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত ভিজি কার্নাডের কাছেও তিনি সংগীত সাধনা করেন, যা তার কণ্ঠে আত্মিকতা ও টান তৈরি করে।

সংগীতের পাশাপাশি বাঁশির প্রতি ছিল তার গভীর প্রেম। বাঁশি ছিল তার একান্ত সঙ্গী—যার সুরে তিনি বেঁধেছেন জীবন, মৃত্যু ও আধ্যাত্মিকতার গল্প। বারী সিদ্দিকীর বাঁশি যেন নিঃশব্দে বলে যেত মানুষের না-বলা কথা। লোকসংগীতের গূঢ় ভাষা আর তার বাঁশির অনুপম সুরের মিলনে জন্ম নিয়েছে আত্মদর্শনের সংগীত।

বারী সিদ্দিকী শুধুই গান গাইতেন না, তিনি গানের মধ্য দিয়ে দর্শন ছড়িয়ে দিতেন। তার গানগুলো ছিল আধ্যাত্মিকতার এক ধরনের রূপায়ণ। “মানুষ ধরো মানুষ ভজো” কিংবা “সাড়ে তিন হাত কবর”—এই গানগুলো মানুষের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আবার উত্তরও দেয়। তার গানের মাঝে বারবার উঠে আসে দরবেশী ভাব, ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবিকতা ও আত্মার মুক্তির আকুতি।

যদিও দীর্ঘদিন ধরেই তিনি গান করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জাতীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ১৯৯৯ সালে। তৌকীর আহমেদ পরিচালিত নাটক কাগজের ফুল-এ ‘শুয়াচান পাখি’ গানটি গাওয়ার পরই সবার নজরে আসেন। তার দরদভরা কণ্ঠ ও বাঁশির মনমাতানো সুর রাতারাতি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে এমন অনেক গান রয়েছে যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে। তার গাওয়া কয়েকটি কালজয়ী গান: শুয়াচান পাখি, আমার গায়ে যত দুঃখ সয়, পুবালি বাতাসে, সাড়ে তিন হাত কবর, মানুষ ধরো মানুষ ভজো। এই গানগুলোতে মিশে আছে মানুষের যন্ত্রণা, প্রেম, বঞ্চনা এবং মোক্ষলাভের আকাঙ্ক্ষা।

বারী সিদ্দিকী ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পী। তিনি বহুবার দেশ-বিদেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশন করে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে লোকসংগীতের দূত হিসেবে পরিচিত হন।
তার গায়কী ছিল একান্ত নিজস্ব। কোনো কৃত্রিমতা বা ভান ছিল না। সেই বাস্তবতাই শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। তিনি সংগীত নিয়ে কখনোই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখেননি। বরং সংগীতকে তিনি দেখতেন আত্মশুদ্ধির উপায় হিসেবে।

বারী সিদ্দিকীর সংগীত তাকে এনে দিয়েছে বহু সম্মাননা। দেশের নানা প্রান্তের সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি পেয়েছেন সন্মাননা ও পদক। তবে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। তার গান যখন রিকশাওয়ালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কৃষক থেকে বিদেশফেরত প্রবাসী—সবাইকে সমানভাবে আলোড়িত করেছে, তখনই বোঝা যায় তার সংগীত কতটা জীবন্ত ছিল।

২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বারী সিদ্দিকী। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সংবাদে দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
তবে বারী সিদ্দিকী মারা গেলেও তার সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। তার গান এখনো ইউটিউব, স্টেজ, সামাজিক মাধ্যম ও লোকজ গানের আসরে নিয়মিত শোনা যায়।

বারী সিদ্দিকী ছিলেন লোকসংগীতের একজন সাধক। তার কণ্ঠে যেমন ছিল গ্রামবাংলার ধুলো-মাটি-আকাশের গন্ধ, তেমনি ছিল দার্শনিক গভীরতা। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একান্ত সাধনার মাধ্যমে লোকসংগীতও হতে পারে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের হৃদয় জয়ের মাধ্যম। আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগেও যখন কোনো সন্ধ্যেবেলায় “শুয়াচান পাখি” বাজে, তখনো বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। বারী সিদ্দিকী নেই, কিন্তু তার গান রয়ে গেছে। আর সেই গানই হয়ে উঠেছে এক বিশুদ্ধ আত্মিক সঙ্গী।

স্মরণে বারী সিদ্দিকী, বাংলার লোকসঙ্গীতের মরমি সাধক।

পুরোনো সংখ্যা

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
%d bloggers like this: