
রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহী টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি)-এর কেনাকাটায় নজিরবিহীন জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নাজমুল হকের নেতৃত্বে একটি চক্র ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। জালিয়াতির ধরণ এতটাই অদ্ভুত যে, ফটোস্ট্যাটের দোকান থেকে কেনা দেখানো হয়েছে রুম স্প্রে, আর স্যানিটারি দোকান থেকে কেনা হয়েছে ছাতা!
অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, নগরীর সোনাদীঘি মোড়ের ‘রোজ ফটোস্ট্যাট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ অফিস সামগ্রী ও পরিচ্ছন্নতা পণ্যের বিল তোলা হয়েছে। ভাউচার অনুযায়ী, সেখান থেকে প্রতিটি ৩৫৫ টাকা দরে ৭০টি রুম স্প্রে, প্রতিটি ১১৫ টাকা দরে ২০০ প্যাকেট টিস্যু এবং ৪৮ হাজার টাকার এ-ফোর সাইজ কাগজ কেনা হয়েছে।
তবে রোজ ফটোস্ট্যাটের মালিক সরাসরি এই কেনাকাটার কথা অস্বীকার করে বলেন, “আমাদের এখানে শুধু ফটোস্ট্যাট ও প্রিন্টিং হয়। এসব মালামাল আমরা বিক্রিই করি না।”
জালিয়াতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয় শাহমখদুম থানার মোড় এলাকার ‘মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ’-এর ভাউচারে। এটি মূলত একটি স্যানিটারি সামগ্রীর দোকান। অথচ এই দোকানের নামে প্রতিটি ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে প্রায় ২০ হাজার টাকার ছাতা ক্রয়ের বিল জমা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ‘ইলেকট্রিক পয়েন্ট’ ও ‘বাবু টেলিকম’-এর নামেও ভুয়া বিল তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট দোকান মালিকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের লোকজন মাঝেমধ্যে ‘ছোট কেনাকাটার’ কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে ফাঁকা রশিদ নিয়ে যেতেন। সেই রশিদে পরে ইচ্ছামতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে জালিয়াতি করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, “মাঝে মধ্যে ছোটখাটো কেনাকাটার কথা বলে ফাঁকা রশিদ নিয়ে যাওয়া হতো। নিজেরা বিল তৈরি করবে বলেই রশিদ নিত। কিন্তু এভাবে বড় ধরনের জালিয়াতি হবে, তা জানতাম না।”
টিটিসি-র গুদাম রক্ষক ইসরাক অভিযোগ করেছেন, গুদামে কোনো মালামাল না ঢোকানোর আগেই এজি অফিস থেকে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম ঢাকতে হিসাব রক্ষক ফরহাদ হোসেনের নেতৃত্বে একটি ‘গন্ডা বাহিনী’ কাজ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনিয়মের কারণে নাজমুল হককে বদলি করা হলেও ‘অদৃশ্য ক্ষমতার’ জোরে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত কাজে (স্ত্রীর যাতায়াত) নিয়মিত প্রতিষ্ঠানের সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
এসব অনিয়মের বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাইতে গেলে প্রতিবেদককে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়। অধ্যক্ষ নাজমুল হক তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রতিবেদকের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। সরকারি দপ্তরে বসে পেশাদার সাংবাদিকদের সাথে এমন অপেশাদার আচরণের ঘটনায় স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে অধ্যক্ষ নাজমুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
ইতিমধ্যেই এই অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, তথ্য কমিশন এবং বিএমইটি (BMET) মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সচেতন মহল দ্রুত একটি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :