সোমবার, ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ - বসন্তকাল || ২৮শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

চকরিয়ায় প্রাইভেট হাসপাতালের নামে ‘গলা কাটা’ চিকিৎসা বাণিজ্য

চকরিয়ায় প্রাইভেট হাসপাতালের নামে ‘গলা কাটা’ চিকিৎসা বাণিজ্য
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় :

নিজস্ব প্রতিবেদক : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা। চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে আসেন আশপাশের উপজেলার সাধারণ মানুষ—দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহিণী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসে অনেকেই এখন পড়ছেন আরেক বিপদে—অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক বিলের বোঝায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চকরিয়ার একাধিক প্রাইভেট হাসপাতালে চলছে অসংযত, অস্বচ্ছ ও অমানবিক চিকিৎসা বাণিজ্য। যেখানে সামান্য ড্রেসিংয়ের জন্য নেওয়া হচ্ছে ১৫০০ টাকা, আবার নির্মাণাধীন, অস্বাস্থ্যকর রুমে রোগী রেখে ৮ ঘণ্টার সার্ভিস চার্জ ধরা হচ্ছে ১২০০ টাকা।

“ড্রেসিং করতেই যেন ডাকাতি”

চকরিয়া উপজেলার এক শ্রমজীবী ব্যক্তি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পাওয়ার পর স্থানীয় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক শুধু ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেন। “ড্রেসিংয়ের জন্য বিল ধরানো হলো ১৫০০ টাকা। কোনো সেলাই হয়নি, কোনো ওষুধও দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদ করলে বলা হয়—এটাই রেট।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে এখানে এসেছি। কিন্তু এখানে তো চিকিৎসা নয়, রীতিমতো ব্যবসা চলছে।”

নির্মাণাধীন রুম, তবু সার্ভিস চার্জ!

আরেক ভুক্তভোগী জানান, অসুস্থ স্বজনকে ভর্তি করাতে গিয়ে তিনি দেখেছেন—রুমের দেয়ালে প্লাস্টার ঝরছে, পাশেই নির্মাণকাজ চলছে, ধুলাবালি ও শব্দে রোগী কষ্ট পাচ্ছেন। “এই রুমের জন্য ৮ ঘণ্টার সার্ভিস চার্জ নিয়েছে ১২০০ টাকা। রুমে ঠিকমতো ফ্যান কাজ করে না, বাথরুমও ব্যবহার অনুপযোগী।”

তিনি প্রশ্ন রাখেন, “যে রুম এখনো তৈরি হয়নি, সেখানে রোগী রেখে কীভাবে পূর্ণ সার্ভিস চার্জ নেয়?”

 

বিলের কাগজে নেই স্বচ্ছতা

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ হাসপাতালেই বিল দেওয়া হয় হাতে লেখা কাগজে। কোথাও নির্দিষ্ট মূল্য তালিকা ঝুলানো নেই। কোন সেবার জন্য কত টাকা নেওয়া হচ্ছে—তা রোগী বা স্বজনদের স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।

এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, “যা খুশি তাই লিখে বিল ধরিয়ে দেয়। প্রশ্ন করলে বলা হয়—ডাক্তার দেখিয়েছেন, সার্ভিস হয়েছে।”

চিকিৎসা নাকি মুনাফাই মুখ্য?

চকরিয়ায় প্রাইভেট হাসপাতালের সংখ্যা বাড়লেও মান নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি কার্যত অনুপস্থিত বলে অভিযোগ। স্থানীয়রা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল মালিক রোগীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মুনাফা লুটছেন।

এক স্থানীয় সচেতন নাগরিক বলেন, “চিকিৎসা এখন সেবা নয়, অনেক জায়গায় এটি ভয়ংকর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় এই অবস্থা।”

এ বিষয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত মনিটরিং ও মূল্য তালিকা যাচাই না হওয়ায় এই অনিয়ম দিনের পর দিন চলতে পারছে।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন এখন একটাই—

ড্রেসিংয়ের নির্ধারিত সরকারি বা নৈতিক মূল্য কোথায়?

নির্মাণাধীন রুমে রোগী রাখার অনুমতি কে দিয়েছে?

সার্ভিস চার্জের মানদণ্ড কী?

দাবি—তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণ জরুরি

ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর মূল্য তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ, অবকাঠামো ও সেবার মান যাচাই, অতিরিক্ত বিল আদায়ের তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু চকরিয়ায় সেই অধিকার এখন অনেকের কাছেই যেন ব্যবসার কাছে জিম্মি। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না হলে এই ‘গলা কাটা’ চিকিৎসা বাণিজ্য আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন ভুক্তভোগীরা।

Copyright © 2022 Star News Agency. All rights reserved.