সর্বশেষ :

রেফ্রিজারেটরের কিস্তির জন্য মারধর, দোকানেই ‘বিষপানে’ ভ্যানচালকের মৃত্যু


অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৩, ২০২৫ । ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
রেফ্রিজারেটরের কিস্তির জন্য মারধর, দোকানেই ‘বিষপানে’ ভ্যানচালকের মৃত্যু

“ঋণ নিতেই হয়, কিন্তু সে ঋণ যেন জীবনটাই না নিয়ে নেয়।” — কথাগুলো বলছিলেন মোহনপুরের সইপাড়া গ্রামের সালমা বেগম, সদ্যপ্রয়াত স্বামী হাশেম মণ্ডলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীর মোহনপুরে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। মাত্র ১০ হাজার টাকা বকেয়া কিস্তি আর ১০ হাজার টাকা সুদের জন্য এক ভ্যানচালকের গায়ে হাত তোলে বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক, কেড়ে নেয় তাঁর উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন—অটোভ্যান। অপমান ও অসহায়তায় বিষ পান করে নিজের জীবনটাই দিয়ে দেন হাশেম।

অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আনতে হাশেম মণ্ডল কিস্তিতে একটি রেফ্রিজারেটর কিনেছিলেন কেশরহাটের আলিফ মীম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি দোকান থেকে। স্ত্রী সালমা জানান, তিনি কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করলেও দোকান মালিক আকরাম আলী ও তাঁর ভাই আকতার হোসেন মিলে বিভিন্ন অজুহাতে হাশেমকে চাপ দিতে থাকেন, দাবি করতে থাকেন সুদের বাড়তি টাকা।

ঘটনার দিন হাশেম যাত্রী নিয়ে কেশরহাট বাজারে গেলে দোকান মালিক ও তাঁর কর্মীরা হঠাৎ করেই জোরপূর্বক তাঁর অটোভ্যানটি ছিনিয়ে নেন এবং তাঁকে মারধর করেন। অপমানিত হাশেম কিছুদূর গিয়ে স্থানীয় বাজার থেকে রাসায়নিক বিষ কিনে সোজা চলে যান সেই দোকানেই। সবার সামনে, দোকানের ভেতরেই বিষ পান করেন তিনি।

এ দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন স্থানীয়রা। কিন্তু দোকানের কর্মীরা তাঁকে সাহায্য না করে বাইরে ফেলে রেখে চলে যান। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় তাঁকে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলেও ভর্তি না করে পাঠানো হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, যেখানে শনিবার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হাশেম।

ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা তাদের দোকান বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, তাঁরা ‘দফারফা’র চেষ্টায় একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তিন লাখ টাকা দিতে চাচ্ছেন হাশেমের পরিবারকে, যাতে মামলা না হয়।

মোহনপুর থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, “অটোভ্যান কেড়ে নেওয়ার ঘটনা সত্যি। এর ফলেই হাশেম বিষ পান করেছেন। তবে এখনো কেউ কোনো মামলা করতে থানায় আসেনি।”

এ যেন এক করুণ চিত্র—নির্যাতিত মারা গেলেও, অন্যায়কারীরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হাশেম মণ্ডলের মৃত্যু শুধুই আত্মহত্যা নয়। এটি সমাজের অসংবেদনশীলতা, অসহায়ত্ব, এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের যৌথ পরিণতি। যেখানে ঋণ মেটাতে না পারলে কেড়ে নেওয়া হয় জীবনের অবলম্বন; আর অপমান সইতে না পেরে মানুষ বিষ খায়।

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে— কিস্তি ব্যবসার নামে যেসব প্রতিষ্ঠান দাদন প্রথায় মানুষ শোষণ করছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ কে করবে? কেন দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন? হাশেমের মতো মানুষদের কি আর কোনো পথ খোলা থাকে?

হাশেম মণ্ডল আর নেই। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন সমাজের প্রতি একটি গভীর প্রশ্ন— ‘দারিদ্র্য কি মানুষের মর্যাদাকেও কিনে নেয়?’
এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে যদি আমরা নীরব থাকি, তবে কাল হয়তো হাশেমের জায়গায় থাকবে আমাদের পরিচিত কেউ।

পুরোনো সংখ্যা

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
%d bloggers like this: