এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা, কে কোন আসনে
অর্থনীতির চাপে আমেরিকানরা, আশাবাদী বার্তা দিচ্ছেন ট্রাম্প
রাজশাহীর দুর্গাপুরের দুই ইউনিয়ন গ্রাম আদালত পরিদর্শন
দুর্গাপুরে বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপনে ‘অদম্য নারীদের’ সম্মাননা প্রদান
দুর্গাপুরে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালিত
টাঙ্গাইলে নিরাপত্তার অভাবে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বাউল গানের অনুষ্ঠান বাতিল
খালেদা জিয়ার এক রোগ নিয়ন্ত্রণে এলে বাড়ছে আরেকটি, লিভার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কিডনি নিয়ে উদ্বেগ
ডাকসু ভবন ও তিন হলের প্রবেশপথে মাটিতে পাকিস্তান-ভারতের পতাকা
ট্রাম্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে একগুচ্ছ চুক্তি করল ভারত
বেগম জিয়াকে লন্ডন নেয়া হবে কি না সিদ্ধান্ত রাতে

এসএনএ ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে এবং ব্যবসার প্রসার ঘটাতে ‘চাঁদা’ এখন একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক কোম্পানির জন্য। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের ক্ষমতাসীন ও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গোপন কিংবা প্রকাশ্য লেনদেনে যুক্ত রয়েছে এমন অন্তত ১০টি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা নিয়মিত রাজনৈতিক চাঁদা দেয় এবং বিনিময়ে পায় বড় বড় ঠিকাদারি, টেন্ডার, রপ্তানি সুবিধা, ভর্তুকি কিংবা কর মওকুফের সুবিধা।
সজীব গ্রুপ : ১৯৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী এই গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রত্যেক সরকারকে মোটা অঙ্কের অনুদান দেয় রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনের সময়। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ অর্থ আওয়ামী লীগের কয়েকটি নেতার মাধ্যমে দেয়া হয় বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। একাধিক সরকারি বিজ্ঞাপন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্প তাদের অনুকূলে আসে নির্বাচনের পরপরই।
ওয়েলস ক্যামিকেলস লিমিটেড : ফার্মাসিউটিক্যালস ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনীতিতে গোপন প্রভাব বিস্তারে এ কোম্পানির অতীত পুরনো। জানা যায়, বিএনপির ২০০১-২০০৬ শাসনামলে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক টেন্ডার জিতেছিল রাজনৈতিক দানবলে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারে এলেও তলে তলে চাঁদা দিয়ে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখে।
আল-মুবারক বিল্ডার্স : পাবলিক ওয়ার্কস, সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, রেলওয়ে – এই সকল সরকারি টেন্ডারের অন্যতম অংশীদার। বিএনপি ঘনিষ্ঠ হলেও ২০১৪ সালের পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতার আত্মীয়কে পরিচালক বানিয়ে কোম্পানিটি প্রতিটি নির্বাচনের আগে মোটা অঙ্কের অর্থ দেয় বলে স্থানীয় প্রশাসনের একজন সাবেক সচিব স্বীকার করেছেন।
পদ্মা ইলেকট্রনিক্স : বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিক পণ্যের একচেটিয়া সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত হলেও তাদের প্রকৃত শক্তি রাজনৈতিক অর্থায়নে। ১৯৯৬ সাল থেকে তারা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিপুল পোস্টার, ডিজিটাল ডিসপ্লে ও ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস সরবরাহ করে বিনিময়ে বড় রপ্তানি লাইসেন্স পায়।
ইস্টার্ন টেক্সটাইলস : তৈরি পোশাক খাতে বিশাল সাফল্য এলেও এর মূল চালিকা শক্তি ছিল রাজনৈতিক চাঁদা। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতার পর জাসদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের উভয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। মালিকের নামে একাধিক ভুয়া এনজিও খোলা হয় যার মাধ্যমে সরকারি অনুদান নেয়া হয়।
রানা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি : এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত রাস্তার নির্মাণ উপকরণ সরবরাহ করে, কিন্তু তাদের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল রাজনৈতিক সংযোগে। ২০০৫ সালে ঢাকায় একাধিক প্রকল্পে সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ করেও অভিযোগে রক্ষা পায়, কারণ তারা একাধিক মন্ত্রীকে চাঁদা দিত বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক প্রাক্তন কর্মকর্তা জানায়।
ডেল্টা ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন : জলবায়ু প্রকল্প, বিদ্যুৎ উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক চাঁদা ছাড়া সরকারি প্রকল্প পাওয়া অসম্ভব ছিল এই কোম্পানির মতে। আওয়ামী লীগের দুই গুরুত্বপূর্ণ উপকমিটিতে তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধি রয়েছে, যিনি নিয়মিত ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করেন।
আলিফ গ্রুপ : নামকরা খাদ্য ও প্রসাধনী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। এরা ১৯৭৫ সালের পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। একসময় তারা জাতীয় পার্টিকে অর্থায়ন করলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগের হয়ে গোপনে কাজ করে। তাদের পণ্য মানহীন হলেও বিটিভি ও সরকারি ব্রডকাস্ট মিডিয়ায় প্রচারণা পায়।
বৃহত্তর সিটি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (GCDEL) : রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন থেকে একাধিক প্রকল্প তারা রাজনৈতিক সংযোগের কারণে পেয়েছে। ২০১২-২০১৭ পর্যন্ত ১১টি প্লট বরাদ্দ পেয়েছে যারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দপ্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে। প্রতিবছর নির্বাচনের সময় নগদ অর্থ সরবরাহের গোপন নথি ফাঁস হয় ২০১৮ সালে।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ : এই গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা দুই প্রধান দলের কাছেই। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে তারা রপ্তানি সুবিধা, বন্ড সুবিধা, করছাড় পায়, আর বিএনপি শাসনামলে পায় বৈদেশিক বিনিয়োগ ছাড়পত্র। একসময় একজন মন্ত্রী তাদের ‘ব্যবসায়িক অভিভাবক’ ছিলেন বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক নির্বাহী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক চাঁদা নিয়মিত হলেও এর কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। নির্বাচন কমিশনের কাছে যেসব হিসাব জমা পড়ে, তা অনেকাংশেই ভুয়া এবং চাঁদার উৎস গোপন থাকে। এর ফলে কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক দান দিয়ে কর ফাঁকি, মানহীন পণ্য বিক্রি, অবৈধ প্লট বরাদ্দ ও জনসম্পদের অপচয় ঘটায়।
দুদক বহুবার এই কোম্পানিগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেও রাজনৈতিক চাপ কিংবা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে অধিকাংশ সময় তদন্ত স্থগিত হয়ে যায়। একটি সূত্র জানায়, শুধুমাত্র “আল-মুবারক বিল্ডার্স”-এর বিরুদ্ধে ৩ বার তদন্ত শুরু হলেও প্রতিবারই তা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে গেছে।
লেখক : মো. মানিক হোসেন
আপনার মতামত লিখুন :